Posted on

ফুসফুসের বাইরে যক্ষা

ফুসফুসের বাইরে যক্ষা

যক্ষা কোন মামুলি রোগ নয়। যক্ষা বাংলাদেশের ২য় ঘাতক ব্যাধি এবং অন্যতম সামাজিক সমস্যা। যে কোন বয়সেই যেমন মানুষের এই রোগ হতে পারে তেমনি শরীরের যে কোন অঙ্গেই হতে পারে এই রোগ। বলা হয়ে থাকে চুল, নখ এবং দাঁত ছাড়া শরীরের এমন  কোন জায়গা নেই যেখানে যক্ষা হতে পারে না। এই রোগ দুই ধরনের। ফুসফুসের যক্ষা ও ফুসফুসে বহির্ভুত যক্ষা। তবে এই রোগীদের শতকরা ৮০ ভাগই ফুসফুসের যক্ষায় ভোগে। বাকি শতকরা ২০ ভাগ ফুসফুস বর্হির্ভুত যক্ষা রোগী। বাংলাদেশে প্রতিবছর যক্ষায় যত রোগীর মৃত্যু হয় তার সবই প্রায় ফুসফুসের যক্ষা রোগী। ফুসফুস বর্হিভূত যক্ষায় একেবারেই কোন রোগীর মৃত্যু হয় না তা নয়, তবে এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা এতই কম যে শতকরা হিসাবে সেটা মোটেই ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। ফুসফুস ছাড়া শরীরের যেসব অঙ্গে এই রোগ হতে পারে সেগুলো হলো, চামড়া,  হাড়, মস্তিষ্ক, গ্লান্ড/গ্রন্থি, কান নাক,  হাড়ের জয়েন্ট, অন্ত্র, হৃৎপিন্ডের আবরণী, ফুসফুসের আবরণী চোখ, কিডনি, মুত্রনালী ও প্রজনন নালী, জরায়ু ইত্যাদি।

ফুসফসের বাইরে যক্ষা
ফুসফসের বাইরে যক্ষা

সব যক্ষায় সাধারণত দুই ধরনের লক্ষণ প্রকাশ পায়। একটি স্থানীয় লক্ষণ অর্থ্যাৎ সযে অঙ্গে যক্ষা হয় সেখানকার স্থাণীয় লক্ষণ এবং অপরটি সাধারণত লক্ষণ। রোগের প্রতিক্রিয়ার ফল এই সাধারণ লক্ষণ তৈরি হয় এবং এগুলো সব ধরনের যক্ষায়ই প্রকাশ পায়। যেমন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিকালে ঘুষঘুষে জ্বর তবে কদাচিৎ এই জ্বর সকালেও হতে পারে। ক্ষুধা মন্দা, ওজন হ্রাস, অকারণে অবসাদ বা ক্লান্তি, বুক ধড়ফড় করা,  অকারনে ভালো না লাগা, নিদ্রাহীনতা, অকারণে শরীরে ঘাম হওয়া ইত্যাদি। এসব লক্ষণের সাথে স্থানীয় লক্ষণ মিলিয়ে নির্ণয় করা হয় ফুসফুসে বর্হিভুত যক্ষা।

সমীক্ষা অনুযায়ী   এক্সট্রা পালমেনারি নিম্নে উল্লিখিত ক্রমানুসারে সাজানো যায়ঃ

১) লিম্প গ্লান্ড/ গ্রন্থি, ২) জেনিটো ইউরিনারি, ৩) ফুসফুসের আবরণী, ৪) মিলিয়ারী, ৫) হাড় ও হাড়ের জয়েন্ট, ৬) কোল্ড এবসেস, ৭) পাকস্থলী ও অন্ত্র, ৮) মস্তিষ্কের আবরণের প্রদাহ (মেনিনজাইটিস), ৯)  হৃদযন্ত্রের আবরণী ও ১০) চামড়া। সব থেকে বেশি এক্সট্রা পালমোনারি টিবি হয় লিম্প গ্লান্ড/ গ্রস্থিতে (শতকরা সাড়ে ৩৭ ভাগ) এবং সব থেকে কম এক্সট্রা পালমোনারি টিবি হয় হৃদযন্ত্রের আবরণী ও চামড়ার (শতকরা শূণ্য দশমিক ৮ ভাগ)। এক্সট্রা পালমোনারি টিবির মধ্যে সব থেকে ভয়াবহ হলো ম্যানিন জিয়াল টিবি (মস্তিষ্কের আবরণের প্রদাহ) ও মিলিয়ন টিবি।

লিম্প গ্লান্ড/ গ্রন্থির টিবিঃ প্রথমত আক্রান্ত গ্লান্ডগুলো ফুলে যায়, লাল হয়, হাত দিলে গরম লাগে। কখনো কখনো গ্রন্থিগুলো পেকে ফেটে যায়  এবং ঘা ও সাইনাস ফরম করে যা সহজে শুকায় না।

কিডনি  ও মুত্রনালীর টিবিঃ যক্ষা জীবানু ফুসফুসে প্রবেশের কিছু জীবানু রক্তের মাধ্যমে কিডনি ও মুত্রনালীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সে ক্ষেত্রে জীবানু প্রবেশের ৫ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে কিডনি ও মূত্রনালীতে এই রোগ হতে পারে। কিডনি ও মূত্রনালীতে যক্ষা হলে বার বার প্রস্রাবের চাপ হয় এবং ব্যথা হয়। কোন কোন সময় ব্যথাটা  পিঠের দিকে যায়। সাধারণত  এই ব্যথা তেমন বেশি অনুভূত না হলেও কখনো কখনো তা তীব্র হতে পারে।

পুরুষ  ও মেয়েদের জন্মনালীর (জেনিটাল) টিবিঃ এটা হলে মেয়েদের সন্তান ধারণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়্ তলপেটে ব্যথা হয় এবং অসুস্থ বোধ করে। এটা পুরুষের হলে তারা যে কোন একটি অন্ডকোষে অস্বস্তিবোধের কথা বলে।

ফুসফূসের আবরণের (প্লুরাল) টিবিঃ সাধারণভাবে ফুসফুস যক্ষায় আক্রান্ত হলে এটা অনেক সময় ফুসফুসের আবরণীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে কয়েক মাসের মধ্যে আবরণীর মাঝখানে পানি জমে। তখন রোগী বুকের নিম্নাংশে ব্যথা অনুভব করে।

মিলিয়ারি টিবিঃ কখনো কখনো যক্ষায় আক্রান্ত স্থান থেকে কোন না কোনভাবে এর জীবানু রক্তস্রোত মিশে সারা শরীর এই রোগ জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হয়। যাদের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা তারাই সাধারণত এ রোগে আক্রান্ত হয়।

হাড় ও হাড়ের জয়েন্টের টিবিঃ কোন ব্যক্তির ফুসফুসে যক্ষার প্রাথমিক ইনফেকশনের পর এর জীবাণু রক্তের মাধ্যমে যে কোন হাড় বা হাড়ের জয়েন্টে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে কারো কারো হাড় বা হাড়ের জয়েন্টে টিবি হতে পারে। ফুসফুসে যক্ষা জীবানু প্রবেশের পর সাধারণত ৩ বছরের মধ্যে এ রোগ দেখা দেয়।

খাদ্যনালী ও পেটের টিবিঃ খাদ্যনালী ও পেটের বিভিন্ন স্থানে টিবি হতে পারে যেমন পেটের আবরণ (পেরিটোনিয়াম), ক্ষুদ্রান্ত, বৃহদান্ত্র, ইসফোগাস, ফেরিঞ্জ,পাকস্থলী, লিভার স্পানিল ইত্যাদি। সাধারণত শিশু এবং যুবকরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। যক্ষাক্রান্ত গরুর দুধ না ফুটিয়ে শিশুদের খেতে দিলে, ধুলোবালিতে মিশ্রিত যক্ষা জীবানু খাবারের সাথে মিলে চামচ বা হাতের আঙ্গুলের মাধ্যমে পেটের মধ্যে প্রবেশ করলে অথবা ফূসফুস থেকে যক্ষা জীবানু রক্তের মাধ্যমে পেটের আবরণের মধ্যে প্রবেশ করলে এই রোগ হতে পারে।

চামড়ায় ও যক্ষা হতে পারেঃ প্রথম চামড়া কেটে গেলে বা ক্ষত হলে বাইরে থেকে যক্ষা জীবানু সেখানে প্রবেশ করলে চামড়ায় এই রোগ হতে পারে। দ্বিতীয়ত ভেতর তেকে রক্তের মাধ্যমে ওই ক্ষতস্থানে যক্ষা জীবানু প্রবেশ করলে সেখানে এই রোগ হতে পারে। ক্ষতস্থান সাধারণ নিয়মে শুকিয়ে যায়। কিছুদিন পড়ে ওই স্থানে ঘা হয়। সাধারণত মুখমন্ডল, হাটুর নিচে এবং পায়ের পাতায় এই যক্ষায় হয়। তবে হাত বা বাহুতে খুব কম হয়।

 

ডা. একেএমডি আহসান আলী

যক্ষা ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ

Please follow and like us:
error
Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *