Posted on

খাদ্যে বিষক্রিয়া

খাদ্যে বিষক্রিয়া
খাদ্যে বিষক্রিয়া
খাদ্যে বিষক্রিয়া
খাদ্যে বিষক্রিয়ার মৃত্যুর খবর মাঝে মধ্যে পত্রিকায় দেখতে পাওয়া যায়। খাদ্যে বিষক্রিয়ার মূলে থাকে অনিষ্টকারী কোন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা প্যারাসাইট। নানা কারণ এগুলো খাবারের মধ্যে থাকতে পারে, সে খাবার পেয়ে এ জীবানুগুলো শরীরের মধ্যে প্রবেশ করে মানুষকে অসুস্থ করে। অনেক সময় খাদ্যে কম বিষক্রিয়া থাকায় কয়েক দিনের মধ্যে শরীর সুস্থ হয়ে যায়্ তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, মারাত্মক হতে পারে। রোগী মারাও যেতে পারে।

খাদ্যে বিষক্রিয়ার লক্ষণঃ সাধারণভাবে প্রথম লক্ষণ হল বমি বমি ভাব, বমি করা এবং পেট খারাপ হওয়া। ঠিক কখন এ লক্ষণ দেখা দেবে বা কতটা ভয়াবহ আকারে দেখা দেবে সেটি নির্ভর করবে খাদ্যে কি ছিল তার ওপর এবং আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্যের ওপর।

সালমোনেল্লা এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার যেটি সাধারণত পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী জন্তুর অন্ত্রের (ইনটেসটাইন) মধ্যে থাকে। ভালো করে মাংস রান্না না করলে এ ব্যাকটেরিয়া নষ্ট হয় না। খাবারের মধ্যে থেকে যায়। এছাড়া অন্যভাবে যেমন পশুপাখির নোংরায় হাত দিয়ে হাত ভালোভাবে পরিষ্কার না করে সে হাতে খাবার ধরলে খাদ্যকে দূষিত করতে পারে। সালমোনেল্লা শরীরে প্রবেশ করলে জ্বর, পেটে খিল ধরা, পেট খারাপ ইত্যাদি দেখা দেয়। এটি যথেষ্ট ভয়াবহ বিষক্রিয়া থেকে সুস্থ হতে এক সপ্তাহের বেশি সময় লাগে। হাসপাতালে না গেলে বা সতর্কতা না নিলে এর থেকে মৃত্যু ঘটতে পারে।

সাধারণত ই কোলাই ব্যাকটেরিয়ার মানুষ ও জন্তু জানোয়ারের মধ্যে বেশি থাকে। এর কয়েকটি প্রজাতি এক ধরনের বিষ বা টক্সিন তৈরি করে যা শরীরের অন্ত্র, মূত্রগ্রন্থি, রক্ত ইত্যাদি আক্রান্ত করে। এ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া দেহে ঢুকলে রক্ত পায়খানা হয়। এটি হলে তাড়াতাড়ি ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। ক্লষ্টিডিয়াম বটুলিনাম ব্যাকটেরিয়া মাটিতে পাওয়া যায়্ এ ব্যাকটেরিয়া মাটিতে পাওয়া যায়। এ ব্যাকটেরিয়া টক্সিনে যে খাদ্য বিষক্রিয়া হয় তাকে বচুলিজম বলা হয়। স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বোতলে বা কৌটায় খাবার সংরক্ষণ না করলে এতে লোকজন আক্রান্ত হয়। যেমন ঠিকমতো পাস্তরাইজড না করা মধু থেকে অনেক সময় খুব  ছোট বাচ্চাদের বচুলিজম হতে পারে। বটুলিনজমের লক্ষণ হল- পেশির ক্ষমতা হ্রাস,  মাথা ঘোরা,  মাথা ব্যথা, ডাবল ভিশন ইত্যাদি। এছাড়াও বমি, পেট খারাপ থাকতে পারে। বচুলিজমে স্নায়ু দুর্বল হয়ে মৃত্যু হতে পারে। এটি হলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যাওয়া প্রয়োজন। টক্সোপ্লাজমা গন্ডাই বলে এক ধরনের এককোষী জীবানুর জন্য টক্সপ্লাজমোসিস হয়। সাধারণত ভালোভাবে রান্না না করা মাংস থেকে শরীরে প্রবেশ করে। ‍মুশকিল হল টক্সিপ্লাজমোসিস লক্ষণ বিশেষ কিছু নেই। অনেক সময় ফ্লুর মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। মোটামুটিভাবে প্রায় সবাই এতে আক্রান্ত হয়ে শরীরে প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু গর্ভবতী নারী ও যাদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা কম,  তাদের ক্ষেত্রে  এটি ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। যথাসময়ে অ্যান্টিবায়োটিক না দেয়া হলে এ রোগের সংক্রমণের ফলে ভ্রুণ নষ্ট হওয়া, মৃত শিশু প্রসব, শিশু জীবিত অবস্থায় জন্মালেও তার মস্তিষ্ক, চোখ  ইত্যাদি স্বাভাবিক না হওয়ার আশংকা থাকে। এইডস রোগী বা যারা ক্যান্সারের জন্য কোমোথেরাপি নিচ্ছে তাদের পক্ষে এ জীবানু শরীরে প্রবেশ করা মারাত্মক।

যেভাবে খাদ্য দুষিত হতে পারেঃ ব্যাকটেরিয়া জন্তুদের অন্ত্রে থাকে। মাংস কাটার সময় এগুলো তার মধ্যে চলে আসে। চাষের সময় ফলমূলে এগুলো চলে আসতে পারে, যদি সেগুলো ব্যাকটেরিয়া দুষিত পানিতে ধোয়া হয়, গোবর অথবা অন্যান্য জন্তুর বিষ্ঠার সংস্পর্শে আসে। মাংস কাটার সয়ে যে ছুরি বা বটি ব্যবহার হচ্ছে,  একই চাকুতে সবজি কাটলে সবজিতে ব্যাকটেরিয়া  এসে যেতে পারে। নানা ব্যাকটেরিয়া জন্তু জানোয়ারের শরীরে মাটিতে, পানিতে,  ধুলায় রয়েছে।  এগুলোর সংস্পর্শে এসে হাত ব্যাকটেরিয়ানাশক সাবান দিয়ে পরিষ্কার পানিতে না ধুয়ে খাবারে হাত দিলে ব্যাকটেরিয়া খাবারে এসে যেতে পারে।

খাদ্য দুষণ রোধঃ খাবার প্রস্তুত করা এবং সংরক্ষণ করার সময় সর্তকতা অবলম্বন করা। হাত ভালো করে সাবান দিয়ে ধোয়া,  যেখানে কটাকুটি হচ্ছে সে জায়গাটি পরিষ্কার রাখা, ভালো করে উত্তমরূপে ভেজে বা সিদ্ধ করে রান্না করা যাতে ব্যাকটেরিয়াগুলো ধ্বংস হয়। সংরক্ষণের জন্য খাবার রেফ্রিজারের রাখা এবং খাবার আগে সেটি আবার খুব ভালোভাবে গরম করা। ডিম, মাংস, মাছ,  দুধ ইত্যাদি যেগুলো সহজে নষ্ট হয়। সেগুলোর ব্যাপারে বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন করা।

খাদ্য বিষক্রিয়ার চিকিৎসাঃ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসা হল কষ্টকে লাঘব করা,  ক্ষেত্রবিশেষে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা। বমি বা পেট খারাপ হলে প্রচুর পানি ও ইলেক্ট্রোলাইটস খাওয়া যাতে ডিহাইড্রেশন না হয়। সে জন্য অনেক সময়ে হাসপাতালে যাওয়া প্রয়োজন। পায়খানা করানোর ওষুধ না খাওয়া বাঞ্চনীয় কারণ এতে ফল উল্টো হতে পারে। বচুলিজম বা ই কোলাইয়ের ক্ষেত্রে আশু হাসপাতালে যাওয়া প্রয়োজন।

 

আফতাব চৌধুরি

সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

Please follow and like us:
error
Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *