Posted on

ক্যান্সার রুখতে অ্যান্টি অক্সিডেন্টস

ক্যান্সার রুখতে অ্যান্টি অক্সিডেন্টস

অ্যান্টি অক্সিডেন্টস শব্দটার সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। বিপাকীয় ক্রিয়ার ফলে এবং পরিবেশের কারনে আমাদের শরীরে ফ্রি র‌্যাডিক্যালস তৈরি হয়। ফ্রি র‌্যাডিক্যালস ক্যান্সারসহ নানা রকম শারীরিক সমস্যা ডেকে আনে। অ্যান্টি অক্সিডেন্টস হল এমনই এক রাসায়নিক যা ফ্রি র‌্যাডিক্যালসকে প্রশমিত করে। ফ্রি র‌্যাডিক্যালস হল অতি মাত্রায় সক্রিয় মুক্ত পরামাণু তাই এরা অনবরত স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করে। অন্য পদার্থের সঙ্গে মিলে স্থিরতা লাভ করতে চায়। এরা অনবরত সেলমেমব্রেন বা কোষ প্রাচীর,  ডিএনএকে আক্রমণ করে। ফলে আরও ফ্রি র‌্যাডিক্যালস তৈরি হয় যতক্ষণ না কোন অ্যান্টি অক্সিডেন্টস এদের নিরস্ত্র করে। অ্যান্টি অক্সিডেন্টসেই শরীরকে ফ্রি র‌্যাডিক্যালস নামক সন্ত্রাসবাদী হানা থেকে রক্ষা করে। আমাদের শরীরের মধ্যে কিছু কিছু এনজাইম রয়েছে। যেমন- সুপার অক্সাইড ডিসমিউটেজ, গ্লাটাথিওন পারঅক্সাইড। এরা এক ধরনের অ্যান্টি অক্সিডেন্টস। কিন্তু এ যুগে পরিবর্তিত  লাইফস্টাইলে  প্রবল মানসিক চাপ, কায়িক পরিশ্রমের অভাব, দূষিত পরিবেশ এবং উল্টা পাল্টা খাওয়া দাওয়ার ফলে শরীরে অতিরিক্ত ফ্রি র‌্যাডিক্যালস তৈরি হয়। এই ফ্রি র‌্যাডিক্যালস ক্যান্সার,  হার্টের অসুখ, উচ্চ রক্তচাপ, নার্ভের অসুখ সর্বোপরি বার্ধক্যকে এগিয়ে আনে। কখনও কখনও বিরূপ পারিপার্শ্বিকতার কারণে দেহের অভ্যান্তরীণ ভারসাম্যের ব্যাঘাত ঘটে ফলে ফ্রি র‌্যাডিক্যালস খুব সহজেই কোষ ও ডিএনএকে আক্রান্ত করে এদের গঠেন ও কার্যকারিতা পাল্টে দেয়। যার ফলে অস্বাভাবিক কোষ কলা তৈরি হয়। এদের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ক্রমান্বয়ে এটি টিউমার বা ক্যান্সারের রূপ ধারণ করে।

ক্যান্সার রুখতে অ্যান্টি অক্সিডেন্টস
ক্যান্সার রুখতে অ্যান্টি অক্সিডেন্টস

ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে কারসিনোজেন নামক এক ধরনের উপাদান যা খাদ্যদ্রব্য বা বাতাস থেকে আমাদের দেহে প্রবেশ করে। কখনও দেহের অভ্যন্তরেও কারসিনোজোন তৈরি হয়। দেহে অ্যান্টি অক্সিডেন্টস পর্যাপ্ত থাকলে অধিকাংশ কারসিনোজেন ক্ষতি করার আগেই প্রশমিত হয়ে যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাণীজ খাবারের চেয়ে উদ্ভিজ খাবারে অ্যান্টি অক্সিডেন্টসের পরিমাণ বেশি পাওয়া যায়। আরও জানা গেছে, উদ্ভিজ চর্বির চেয়ে প্রাণিজ চর্বিতে ক্যান্সারের ঝুকি বেশি। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা ক্যান্সারের সাথে চর্বিযুক্ত খাবারে যোগসুত্র খুজে পেয়েছেন। যুক্তরাজ্যে ক্যান্সার গবেষক ডা. নেসলি ওয়াকার জানান, খাবার এবং ক্যান্সারের মধ্যে যথেষ্ট সম্পৃক্ততা রয়েছে। ক্যান্সারের ঝুকি এড়াতে খাবারে গ্রহণে যে সর্তকতার প্রয়োজন তার গবেষণায় সেটিই গুরুত্বের সঙ্গে তুল ধরা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ক্যান্সার এখন মহামারী আকার ধারণ করছে। আজকাল উন্নত দেশগুলোতে ফাস্টফুডের বিরুদ্ধে সেচ্চার হয়ে ক্রমশ ভেজিটেরিয়ানিজমের দিকে ঝুকে পড়ছে অথচ আমাদের দেশের সচ্ছল তরুল তরুণীরা উচ্চ চর্বিযুক্ত ফাস্টফুড নির্দ্ধিধায় খাচ্ছে। আমাদের জানা প্রয়োজন কোন কোন খাবার ক্যান্সার হতে বাধা দেয়। দীর্ঘজীবী হওয়ার সাধ কার না আছে ? কে না চায় রোগ ব্যাধির সঙ্গে যুদ্ধ করে সুস্থভাবে বাঁচতে ? আর মরণব্যাধি ক্যান্সার বা অন্যান্য রোগব্যাধির মোকাবিলার এগিয়ে আসে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। অনেকে ভাবতে পারেন অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হয়তো অনেক নামিদামী খাবার। এই ধারণটা ঠিক নয়। বিধাতা আমাদের দেহের সুস্থতার জন্য অনেক সস্তা, সহজলব্য খাবার সৃষ্টি করেছেন যা থেকে আমরা অ্যান্টি অক্সিডেন্ট পেতে পারি। আমাদের দৈনন্দিন খাবারের ম্যেধই আছে অ্যান্টি অক্সিডেন্টস। আলফা ক্যারোটিন, বিটা ক্যারোটিন, লাইকোপিন, ক্রিপটোজ্যানথিন, ক্যানজ্যানথিন, ফাইটোইস্ট্রোজেন, বায়োফ্ল্যাভোনয়েডস, ট্যানিন, লিউটেন, পলিফিনলিক  এসিড, ভিটামিনি এ  ই সি, আয়রণ, কপার, জিংক, সিলোনিয়াম ইত্যাদি অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।

শাক সবজি এবং ফলমুলে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টি অক্সিডেন্টস যা আমরা প্রতিনিয়তই খেতে পারি। টাটকা শাক সবজিতে যেমন- পালং শাক, পুইশাক, লাউ কুমড়া শাক, লালশাক, ধণে পাতা, পুদিনা পাতা, সজনে শাক ডাটা, ঢেড়স, গাজর মটরশুটি, বরবটি ইত্যাদিতে আছে ভিটামিন সি, বিটাক্যারোটিন- ক্যান্সার প্রতিরোধে এই অ্যান্টি অক্সিডেন্টসের ভুমিকা অপরিসীম। টক জাতীয় ফলের রস- আমলকি,  আনারস, লেবু, কমলালেবু, কাচা আম, টমেটো, বেদনা, বাতাবী লেবু,  আমড়া পেয়ারা ইত্যাদিতে আছে ভিটামিন সি জাতীয় ক্যান্সাররোধী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। লাইকোপিন নামক উচ্চ মানের অ্যান্টি অক্সিডেন্ট রয়েছে নটেশাক, তরমুজ এবং টমোটোতে। পাকা পেপে, পাকা আম, পাকা কুমড়া, কালো জামে আছে ক্রিপটোজ্যানথিন। লিউটেন নামক অ্যান্টি অক্সিডেন্ট পাওয়া যায় কালো জামে। ফাইটোইস্টোজেনের ভালো উৎসা হলে সয়াবিন। এছাড়াও রয়েছে বরবটি, শিম, মটরশুটি, কমলালেবু,  আম, জাম, কালো, আঙ্গুর, বেদানা, গাজর, বীট, লেটুস, ঢেড়স, ক্যাপসিকাম ইত্যাদিতে বায়োফ্ল্যাভোনয়েডস, যুক্ত খাবার হলে চা, আঙ্গুর, বাধাকপি, ফুলকপি, হলুদ, সর্ষে ইত্যাদি। এ ধরনের অ্যান্টি অক্সিডেন্ট স্তন ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার, ডিম্বশয়ের ক্যান্সার প্রতিরোধে বেশি কার্যকরী। ভিটামিন ই রয়েছে সয়াবিন, ছোলা, বাদাম, সূর্যমুখীর তেল ও বীজ, আটা, হরেক রকম ডাল ইত্যাদিতে। নানা রকম শস্য অর্থ্যাৎ চাল, গম, ডাল, সয়াবিন, শুকনো ফলে মানে কিসমিস, খেজুর, বাদাম ইত্যাদিতে রয়েছে কপার। সিলোনিয়াস পাওয়া যায় দুধ, মাংস আর সামুদ্রিক মাছে। বালাই বাহুল্য এসবই অ্যান্টি অক্সিডেন্টস যা আমাদের শরীরকে ক্যান্সার ও নানা রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তোলার শক্তি জোগায়। যেসব খাবারে অ্যান্টি অক্সিডেন্টস আছে তাদের সিংহভাগই নিরামিষ। গবেষণায় দেখা গেছে, নিরামিষকারীদের সব ক্যান্সারই কম হয়। যারা বেশি পরিমাণে চর্বিযুক্ত ও আমিষসমৃদ্ধ খাবার খান তাদের ক্যান্সারের আংশকা ৫০% বেশি। তাই আমাদের উচিত নিত্য দিনের খাদ্য তালিকায় টাটকা শাকসবজি, ফলমুল বেশি থাকা আর চর্বি জাতীয় খাদ্য যথা সম্ভব এড়িয়ে চলা যা ক্যান্সার প্রতিরোধ যথেষ্ট সহায়ক।

 

ডা. জ্যোৎস্না মাহবুব খান

হাসান ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্স

মুক্তগাছা, ময়মনসিংহ।

Please follow and like us:
error
Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *